,

খোদা বক্স মৃধা : এক মৃত্যুঞ্জয়ী কণ্ঠ যোদ্ধা

News

ছোট বেলায় আমার বিনোদনের প্রধান মাধ্যমই ছিল বাংলা সিনেমা। প্রচুর সিনেমা দেখতাম সে সময়। স্কুল ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গেও সিনেমা দেখেছি। মা-খালার কোলে বসে সিনেমা দেখায় হাতেখড়ি; প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে সেই যে গাঁটছড়া। ওই সম্পর্ক ২০০৬ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। যতদিন মা বেঁচে ছিলেন। আমরা সপরিবারে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখতে যেতাম। প্রতিবেশীরাও সঙ্গের সঙ্গী হতেন মাঝে-মধ্যে। সিনেমার গানও ছিল আমার ভীষণ পছন্দের। বাংলা গান শুনতাম। বিশেষ করে সিনেমার গান। এখনো শুনি।

প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি টেলিভিশনেও সে সময় প্রচুর বাংলা সিনেমা দেখেছি। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিটিভিতে তখন সিনেমা দেখাত। দুই-আড়াই ঘণ্টার সিনেমা বিকেল ৩টার সংবাদের পর পর শুরু হয়ে শেষ হতে হতে সন্ধ্যা ৭টা বেজে যেত। সিনেমার দৃশ্য দেখানোর চেয়ে বিজ্ঞাপনই ছিল বেশি। স্পষ্ট মনে পড়ে, আমরা ছোটরা বিজ্ঞাপনের সংখ্যা গুনতাম (হাতের কড়ে)। এক-একটা বিরতিতে ৪১-৪৫টা পর্যন্ত বিজ্ঞাপন দেখানো হতো। মাঝে-মধ্যে বিরক্ত হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে আবারো টেলিভিশনের সামনে এসে বসতাম। বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলগুলো ছিল দুর্দান্ত। অনেক জিঙ্গেল সে সময় মুখস্ত ছিল। সেগুলো গুন গুন করে গাইতামও।

সিনেমার পাশাপাশি ‘ছায়াছন্দ’ নামে একটা গানের অনুষ্ঠান হতো। অনেক রাতে সেটি প্রচার হতো। সম্ভবত রাত ১০টার বাংলা এবং ইংরেজি সংবাদের পর। আমরা ছোটরা অত রাত অবধি কমই জাগতাম। সপ্তাহের শনি কিংবা সোমবার ছায়াছন্দ দেখাত। ছয় থেকে সাতটা গান দেখানো হতো। একই গান ঘুরে-ফিরে। চোখে পানি-টানি দিয়ে আধো ঘুম, আধো জাগরণ অবস্থায় ছায়াছন্দ অনুষ্ঠানটি দেখতাম। ওই যে বললাম বাংলা সিনেমার গান ছিল আমার ভীষণ পছন্দের।

টেলিভিশনের পাশাপাশি রেডিওতে (বেতার) প্রচুর গান শুনতাম। মাজহারুল ইসলাম নামের একজনের কণ্ঠই ওই সময় বেশি শোনা যেত। বিনোদন অনুষ্ঠান মানেই মাজহারুল ইসলাম। তিনি নিজেকে বিনোদন বন্ধু বলেই পরিচয় দিতেন। ১৯৯৯ কিংবা ২০০০ সাল হবে; ঠিক মনে নেই। মা আমাকে একটা রেডিও কিনে দিয়েছিলেন। ওই সময় ছোট সাইজের নতুন মডেলের রেডিও বের হয়েছিল। নাম-ধাম মনে নেই। এতটুকু মনে আছে ছোট এন্টেনাযুক্ত রেডিওটিতে বেশ কয়েকটি চ্যানেল ধরত। আমি নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চ্যানেল ধরতাম। নানা রকম অনুষ্ঠান শুনতাম।

মাজহারুল ইসলাম সাহেবের কণ্ঠ আমাকে ভীষণ আন্দোলিত করতো। তাকে নকল করার চেষ্টা করতাম। ভরাট, দরাজ এবং মিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন বিনোদন বন্ধু মাজহারুল ইসলাম। কী দারুণভাবেই না সিনেমার প্রচার চালাতেন ভদ্রলোক। বিউটিকুইন শাবানা, লাস্যময়ী ববিতা, প্রিয়দর্শনী মৌসুমি, হার্টথ্রুব রিয়াজ, তিলোত্তমা দিতি আরো কতসব উপাধি যে নায়ক-নায়িকাদের দিতেন। প্রযোজক-পরিচালকদের ক্ষেত্রেও তার বিশেষণের ভাণ্ডার ছিল অফুরন্ত।

মায়ের কিনে দেয়া রেডিওটি সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল। এমনও হয়েছে ঘুমানোর সময়ও রেডিটি বালিশের নিচে রেখে ঘুমাতাম। স্কুল, মাঠ এবং রেডিও তিনে মিলে ছোট্ট জীবন। পড়াশুনায় ভালো ছিলাম। খেলাধুলাতেও। বিশেষ করে ক্রিকেটটা দারুণ খেলতাম। এলাকার টিমে ফাস্ট বোলার ছিলাম, ভালো ফিল্ডারও। লংঅফ, লংঅনে ফিল্ডিং করতাম। ক্যাচ কখনো মিস হতো না। সে সময় বেশ কিছু খেপও খেলেছি। শরীয়তপুরে লঞ্চে চড়ে খেলতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। ঢাকার মিরপুর, লালমাটিয়া, নটরডেম কলেজ, টিঅ্যান্ডটি মাঠ, আফতাবনগর, কমলাপুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, গভর্নমেন্ট স্কুল, বিসিএসআইআর স্কুল সংলগ্ন মাঠ- ঢাকা শহরের বহু জায়গায় ক্রিকেট খেলেছি। রেডিওতে ওই সময় প্রচুর ধারাভাষ্য শুনেছি। ক্রিকেট-ফুটবল দুটোরই। খোদা বক্স মৃধা, আলফাজ উদ্দিন আহমেদ, ড. সাইদুর রহমান, সামসুল ইসলাম, রকিবুল হাসানদের ধারাভাষ্য রেডিওতে শুনেছি।

ওই সময়ের ধারাভাষ্যকাররা কী চমৎকারভাবেই না ঘটনার বর্ণনা করতেন। মনে হতো মাঠে বসেই খেলা দেখছি। প্রমিত বাংলায় কথা বলতেন তারা। তাদের উচ্চারণ, শব্দের প্রয়োগ, উপমার ব্যবহার কখনোই বাহুল্যদোষে দুষ্ট ছিল না। তাতে অতিকথনও ছিল না; ভুলভাল তো নয়ই। প্রত্যেকেই ছিলেন প্রত্যৎপন্নমতি। এরপর এফএম রেডিওর যুগে প্রবেশ করল দেশ। অধঃপতনের সেই যে শুরু; এখনো তা থেকে উত্তরণ হয়নি। এফএম থেকে রেডিওর নতুন ভার্সন ব্লটুথ স্পিকার, আরো কত কী যে বাজারে এসেছে। আর ধারাভাষ্যকারের পরিবর্তে জকি-ফকিরা রেডিওর দখল নিয়েছে। অনেক শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা রেডিও পেশায় এসেছে ঠিকই; কিন্তু পূর্বসুরিদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে কী? এফএমের যুগে অনেক ধারাভাষ্যকার অন্তরালে চলে গেছেন। খোদা বক্স মৃধা স্যারের মতো অনেকে আবার পৃথিবীর মায়া ছেড়ে হয়েছেন পরবাসী।

খোদা বক্স মৃধা স্যারের কথা বলছিলাম। রাজশাহী সরকারী কলেজের শিক্ষক ছিলেন। ক্রীড়াঙ্গনে যার বহুমাত্রিক পরিচয়। খেলোয়াড়, ধারাভাষ্যকার, সংগঠক। রেডিওতে স্যারের অনেক ধারাভাষ্য শুনেছি। এখনো স্যারের কণ্ঠ কান পাতলেই যেন শুনতে পাই। আজ স্যারের নবম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১০ সালের এই দিনে পৃথিবীর মায়া ছাড়েন তিনি। দুদিন আগে দেশের জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার সামসুল ইসলাম ভাই ইনবক্সে স্যারের মৃত্যু দিবসের কথাটি স্মরণ করিয়ে দেন। একই সঙ্গে স্যারের মৃত্যুবার্ষিকীতে খোদা বক্স মৃধা ফাউন্ডেশন আজ দোয়া-মাহফিলসহ কোথায় কী আয়োজন করছে সেটিও জানান। সামসুলকে ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

খোদা বক্স মৃধা স্যারকে আল্লাহ ভালো রাখুন- এমনটাই কামনা….

* ক্রীড়া সাংবাদিক মামুন হোসেনের ফেসবুক থেকে নেওয়া।

     এ জাতীয় আরও খবর
Vladimir Ducasse Jersey